শনিবার, ২০শে জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ , ৫ই শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ ||
  • প্রচ্ছদ
  • স্বাস্থ্য
  • টেস্ট দেখে তারা ঘাবড়ে গেলেন
  • টেস্ট দেখে তারা ঘাবড়ে গেলেন

    মনির উদ্দিন, একুশ বছর বয়সের তরুন। ২৩ মার্চ ২০১৯ খ্রি. তারিখে তার বড় ভাই এবং এক চাচা অনেটা ধরাধরি করে আমাদের চেম্বারে আনলেন। জানতে চাইলাম কি সমস্যা- তারা জানান কয়েকদিন ধরে মনিরের জ্বর। এর জন্য স্থানীয় চিকিৎসা নেয়া হয়েছে, এতে মনিরের জ্বর সামান্য কমেছে কিন্তু প্রচণ্ড বমি দেখা দিয়েছে। কোন ঔষধ-পথ্যে তার বমি কমতেছে না। এতে সে খুবই দুর্বল হয়ে গেছে। চোখমুখ বসে গেছে, উঠে দাঁড়াতে পারে না। মাথা ঘুরে পড়ে যেতে চায়। পরিবারের সবাই মনিরের অসুস্থতায় ঘাবড়ে যায়। তার এক চাচা শহরের একটি ক্লিনিকে চাকুরী করেন, সেই হিসাবে শহরের সব বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তার জানা শুনা। তার ঐ চাচা নিজেই মনিরের বড় ভাইকে নিয়ে তার উন্নত চিকিৎসার জন্য শহরের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের নিকট নিয়ে এসেছেন। উনি রোগীর কথা শুনে প্রায় আট হাজার টাকার বিভিন্ন ধরনের টেস্ট দিয়ে রিপোর্ট দেখাতে বলেন। এতে রোগী, রোগীর বড়ভাই ও চাচা আরও বেশি ঘাবড়ে যান। না জানি সবার আদরের শান্তশিষ্ট পরিবারের সবার প্রিয় মনিরের মারাত্মক কিছু হয়েছে কিনা, না চিকিৎসক রোগীর রোগ নির্ণয় করতে পারেন নি। না কি রোগীকে বাড়তি টেস্ট দিয়ে বানিজ্য করার মনোভাব। তারা ৩ জনই ভাবতে লাগলেন। অবশেষে ঐ ক্লিনিকে বসেই তারা আরো কয়েকজন বন্ধুবান্ধবের সাথে পরামর্শ করে অবশেষে রোগীকে নিয়ে আমাদের নিকট আসলেন।

    আমরা তাদের প্রাথমিক কথা খুব মনোযোগসহকারে শুনলাম। রোগীর বড়ভাই বললেন রোগী এখন ট্যাবলেট, পানি, খাবার কোন কিছুই খেতে পারছে না। কোন কিছু মুখে নিলেই বমি আসে, বমি হয়। এছাড়া এই কয়দিন তো আমরা চিকিৎসা নিয়ে দেখেছি, আশানুরূপ ফল পাচ্ছিনা এখন আবার অনেকগুলি টেস্টের যাঁতাকলেে পড়ে গেলাম। এখন তারা হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা নিবেন। আমরা সাধারণত অন্য চিকিৎসকের চিকিৎসা গ্রহণকারী কোন রোগী আমাদের নিকট চিকিৎসা নিতে আসলে তাকে আরো ধৈর্যসহকারে ঐ চিকিৎসকের চিকিৎসা নিতে বলি। এতে অনেক সময় অনেক রোগী সাময়িকভাবে মনে কষ্ট পান। যাক আমরা এই রোগীকেও বুঝাতে চেষ্টা করলাম আপনারা যে চিকিৎসকের নিকট গিয়েছেন তার চিকিৎসা নিয়ে দেখেন। হয়তো আল্লাহর রহমতে সুস্থ হবেন। রোগী জানান আমার বর্তমান অসুস্থতা এমন পর্যায়ে চলে গেছে যে আমি বর্তমানে মুখ দিয়ে একটা ট্যাবলেটও গিলতে পারছি না, বমি হয়ে যায়। এমন কি পানি ও গিলতে পারছি না। হোমিওপ্যাথিক ঔষধ সাধারণত স্বল্প মাত্রার, মিষ্টি ও সেবনে অনেক নিরাপদ, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া মুক্ত, তাই আমরা পরিস্থিতির কারণে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা গ্রহণ করা ছাড়া উপায়ান্ত দেখছিনা। সার্বিকভাবে রোগীর অবস্থা বিচারে তার জীবন রক্ষার স্বার্থে আমরা তাকে চিকিৎসা দিতে রাজি হলাম।

    আমরা দীর্ঘ সময় ধরে রোগী নিজের বিবরণ, তার বড়ভাই এবং তার চাচার মুখ থেকে বিস্তারিত জেনে একটি পূর্ণাঙ্গ রোগীলিপি নিলাম। রোগীলিপি নিয়ে ঔষধ নির্ণায়ক যে লক্ষণাবলী পেলাম তা হল গত কয়েকদিন ধরে রোগীর জ্বর, জ্বরের কারণ হিসাবে জানান, গরমের মধ্যে হঠাৎ বৃষ্টিতে ভিজে, এরপরে জ্বর আসে। এর জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এন্টিবায়োটিক সহ জ্বরের ঔষধ সেবন করে যাচ্ছেন। কিন্তু জ্বর সামান্য কমলেও তার এখন নানা প্রকার উপসর্গ দেখা দিয়েছে। শরীরে ব্যথা, খুব জোরে টিপলে আরাম লাগে। মুখ, জিহ্বা, গলা ঠোঁট সবকিছু যেন শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে সাথে প্রচণ্ড বমি দেখা দিয়েছে। কোন খাবারই মুখে নিতে পারেন না, বমি হয়ে যায়। পানিও পান করতে পারেন না, এমনকি ট্যাবলেটও গিলতে পারছেন না। জিহ্বা সাদা ময়লাবৃত দেখতে শুষ্ক, রোগী বলেন মুখ তিতা। অনেকক্ষণ পর পর পিপাসা আসে কিন্তু পানি মুখে নিলে বমি আসে। পেটের উপরের অংশে প্রচণ্ড ব্যথা, চেপে ধরলে আরাম লাগে, পেট গরম। সমস্ত গায়ে সূূঁই ফোটানো ব্যথা। প্রস্রাব হলুদ, দুর্গন্ধ বেশি, জ্বালাপোড়া নাই। রোগীর গরম অসহ্য। ঘাম বেশি। ঘুম ভাল, চুপ করে শুয়ে থাকতে মন চায়। ঝাল, টক, মিষ্টি স্বাভাবিক পছন্দ। মাংস প্রিয়, মাছ, ডিম, দুধ কম পছন্দ। ক্ষুধা রুচি কম। কম কথা বলেন, স্বরণশক্তি ভাল। কাজে চালু। পায়খানা কষা। রাত্রে বেশি খারাপ লাগে। বর্তমানে চুপচাপ শুয়ে থাকলে ভাল লাগে।

    আমরা মনির উদ্দিনের বর্তমান রোগ লক্ষণের সাথে হোমিওপ্যাথিক যে ঔষধটির বেশি মিল পেয়েছি তা হল “ব্রায়োনিয়া এল্বা”। উক্ত ঔষধ সেবনে অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে রোগী সৃষ্টিকর্তার অসীম কৃপায় বিনা কষ্টে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীনভাবে সম্পূর্ণরূপে আরোগ্যে লাভ করে।
    লেখকঃ সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক পরিষদ, ফেনী জেলা।

    আরও পড়ুন

    error: Please Contact: 01822 976776 !!